রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পরই প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির ঘোষণা দিয়েছিল। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করেছে প্রথম দিন থেকেই। এরমধ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে তারা। এই সম্মিলিত পরিকল্পনাই শুরুর একমাসে জনগণের কাছে একটা ভালো বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

নির্বাচনের আগে বিএনপি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে, তা হলো ফ্যামিলি কার্ড। সরকার গঠনের পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তারা সেই কার্যক্রম শুরুও করেছে। সরকারের এ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পাইলটিং কর্মসূচিতে প্রথম পর্যায়ে ১৪টি ইউনিটে ১০,০০০ পরিবারকে এ কার্ড প্রদান করা হবে। পরবর্তীতে প্রতি ধাপে ১০,০০০ করে বৃদ্ধি করে ২০২৬ এর জুনের মধ্যে বিভিন্ন ইউনিটে ৪০০০০ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতাভুক্ত করা হবে। যদিও সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এই ফ্যামিলি কার্ডকে সর্বজনীন করার কথা জানিয়েছেন।
বর্তমান সরকারের আরেক উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে নানা মহলে। তা হলো দেশের মসজিদসমূহের ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের দায়িত্বশীলদের জন্য প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় সম্মানী প্রদান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রথম পর্যায়ে একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় সারা দেশের চার হাজার ৯০৮টি মসজিদ ও এক হাজার ৫৩০টি অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় (মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধ বিহার) এই সম্মানীর আওতায় আসবে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি মসজিদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইমাম পাবেন পাঁচ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন তিন হাজার টাকা ও খাদেম পাবেন দুই হাজার টাকা।
একইভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় উপাসনালয়ের জন্যও মাসিক আট হাজার টাকা করে সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতিটি মন্দিরের পুরোহিত পাঁচ হাজার ও সেবায়েত তিন হাজার টাকা, বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ পাঁচ হাজার ও উপাধ্যক্ষ তিন হাজার টাকা এবং গির্জার যাজক পাঁচ হাজার ও সহকারী যাজক তিন হাজার টাকা করে মাসিক সম্মানী পাবেন। এই অর্থ সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। এছাড়া ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে (ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিন) বিশেষ বোনাস প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, তারা সরকার গঠন করতে পারলে খাল খনন করতে নিজে যাবেন বিভিন্ন এলাকায়। তিনি সেই কথা রেখেছেন। সরকার গঠনের একমাসের মধ্যেই প্রতিশ্রুত সেই খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিজের ছেলেবেলার স্মৃতিধন্য দিনাজপুর দিয়ে শুরু করেছেন কার্যক্রম।
ইরানে অব্যাহত আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা জবাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থায় টালমাটাল পুরো বিশ্ব। এর রেশ পড়েছে বাংলাদেশেও। জ্বালানি সংকট হতে পারে, এমন শঙ্কা থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু থেকেই চালিয়েছে বিএনপি। যা বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এরইমধ্যে ভারত থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে ৫ হাজার টন ডিজেল এসেছে। আরও ৩৪ হাজার টন ডিজেল এপ্রিলে আসার কথাও জানা গেছে।
সরকার গঠনের পরপরই শুরু হয় রোজার মাস। এই সময়ে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দেখা যায় প্রতিবারই। যারা ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়ে বাড়তি মুনাফা পকেটে ভরে। বর্তমান সরকার ক্ষমতার আসার পর থেকেই বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলেছে। নিয়মিত ভোক্তা অধিদফতরের অভিযান চলেছে। সবজি, ডিম, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে কমবেশি সবকিছুর দামই ছিল সহনীয় পর্যায়ে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। যা তার মন্ত্রী-এমপিরাও নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে নেতাকর্মীদের সেই বার্তা সম্পর্কে সচেতন করছেন।
এসব কার্যক্রম ছাড়াও ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর কিছু আচরণও প্রশংসা কুড়িয়েছে। নিজের গাড়ি ব্যবহার করছেন। ঠিক ৯টায় উপস্থিত হচ্ছেন অফিসে। এতে বাধ্য হয়ে অন্য কর্মকর্তারাও সময়মতো অফিসে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। নিজ কার্যালয়ের অতিরিক্ত লাইট বন্ধ করে দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। যে তাপমাত্রায় এয়ার কন্ডিশনের বিল কম আসে, সেই তাপমাত্রায় এসিও ব্যবহার করছেন। অন্যদেরও সেভাবে ব্যবহারে উৎসাহিত করছেন।

পোশাকে অতিসাধারণ প্রধানমন্ত্রীও নজর এড়ায়নি। সব জায়গায় কেতাদুরস্ত প্রধানমন্ত্রী যেখানে দেখে অভ্যস্ত সবাই, সেখানে সাধারণ পরিপাটি পোশাকেই উপস্থিত হচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন আয়োজনে প্রধান অতিথির বাহারি চেয়ার সরিয়ে তিনি বসছেন সাধারণ চেয়ারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন সরকারের এই স্বল্প সময়কে মূল্যায়ন করেছেন নিজের ফেসবুক পেজে। তিনি বলেছেন, প্রতিটি মুহূর্তে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। এই পদক্ষেপগুলো শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, এটি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার স্পষ্ট প্রতিফলন।