উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে বয়ে চলা এক সময়ের প্রমত্তা ও ঐতিহ্যবাহী ঘুমধুম খালটি এখন দখলদারিত্ব এবং চরম দূষণের কবলে পড়ে তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে। কুতুপালং বাজারের স্তূপীকৃত বর্জ্য আর এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলের কারণে খালটি বর্তমানে একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বাজারের যাবতীয় পচনশীল ময়লা-আবর্জনা ও ক্ষতিকর প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে খালের কচুবনিয়া পয়েন্টটি ইতিমধ্যে পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। শুধু বাজারের বর্জ্যই নয়, বরং পার্শ্ববর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দূষিত পানি ও বর্জ্যবাহী বড় বড় ড্রেনগুলোর সংযোগ এই খালের সাথে দিয়ে পানিকে চরমভাবে বিষিয়ে তোলা হয়েছে। দীর্ঘ এক যুগ ধরে চলা প্রশাসনের এই চরম অবহেলা এবং বর্জ্যের তীব্র উৎকট দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের নাভিশ্বাস উঠেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে সরাসরি এলাকার জীবন-জীবিকা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর। শত শত টন বর্জ্যে খালের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকায় কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে এবং বর্জ্য মিশ্রিত সেই বিষাক্ত পানি জনপদ ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তজোড়া কৃষি জমিতে। এই রাসায়নিক ও পচনশীল বর্জ্য মিশ্রিত পানির কারণে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে এবং শত শত একর আবাদি জমি চিরতরে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বর্ষার সময় খালের পানি উপচে পড়ে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এখন নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময়ের আর্শীবাদ এই খালটি এখন দুই উপজেলার মানুষের জন্য এক অভিশপ্ত যন্ত্রণার নাম।
বাজার ইজারদার বোরহান উদ্দীন এই পরিস্থিতির জন্য একটি বিশেষ ভূমিদস্যু সিন্ডিকেটকে দায়ী করে জানান যে, খালের পাড়ের ভূমিদস্যুরা দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং খালের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করে রেখেছে। অথচ এই প্রভাবশালী চক্র সরকারি কোনো ভ্যাট, ট্যাক্স বা টোল প্রদান করে না। তবে খালটি উদ্ধারে ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি জহির আহমদও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এই বিশাল বাজারে বর্জ্য ফেলার জন্য সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়েই সব ময়লা খালে ফেলা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের পাশাপাশি এলাকায় নিরাপদ পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, নাফ নদীর মোহনা সংলগ্ন এই ঘুমধুম খালে এক সময় জোয়ার-ভাটা হতো এবং এর গভীরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দুই উপজেলার হাজারো মানুষ এই খালের মাছ ধরে এবং এর পানি ব্যবহার করে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করত। অথচ কালের বিবর্তনে এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটির প্রায় ৮০ শতাংশই এখন বর্জ্য আর মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে। বর্তমানে খালটি দখলমুক্ত করে এবং সরকারিভাবে দ্রুত খনন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
খাল ভরাট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আসমা বলেন, উপজেলার প্রতিটি বাজারে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বে নতুন বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বর্তমানে বিভিন্ন পয়েন্টে ডাস্টবিন স্থাপন এবং ময়লা অপসারণের জন্য নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন নির্বাচনের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে পুরো উপজেলার জন্য একটি আধুনিক ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্ট’ স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আসন্ন বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের পানি প্রবাহ সচল রাখতে এবং ময়লা যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য দ্রুত খাল খননের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ রক্ষায় প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এলাকাবাসী আশা করছেন, প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই খালটিকে পুনরায় জীবিত করবে এবং তাদের এই দুর্বিষহ দূষণ থেকে মুক্তি দেবে।