কক্সবাজারের উখিয়ায় আওয়ামীলীগ সমর্থিত এক প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে জমি জবরদখল, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ভাড়া আত্মসাৎ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার (২৮ নভেম্বর ২০২৫) সকাল ১০টার দিকে পালংখালী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের বালুখালী মরা গাছতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, বালুখালী শিয়ালিয়া পাড়ার নুরুল হক (৫৫) এবং তার ছেলে পুলিশ কনস্টেবল সালাহ উদ্দিন (২৮)সহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক অন্যের জমি দখল, ভাড়ার টাকা আত্মসাৎ ও নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছে। এসব অভিযোগ তুলে একই এলাকার শামসুল আলম নামে এক ভুক্তভোগী উখিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, জমিদারপাড়া এলাকার শামসুল আলম, নজু মিয়া ও কবির আহমেদ এই তিনজন ২০০৩ সালে ৫ একর বনজ জমি চাষাবাদ ও বনের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করে জীবিকা অর্জনের উদ্দেশ্যে দখলীয় প্লট নেন।
পরবর্তীতে জমিটির প্রায় ৪ একর রোহিঙ্গা শিবিরের আওতাভুক্ত হয়ে যায়। অবশিষ্ট ১ একর জমির প্রকৃত ভোগদখলীয় মালিক হিসেবে তিনজনেরই অধিকার থাকা সত্ত্বেও বাহির থেকে এসে নুরুল হক ও তার ছেলে সালাউদ্দিন প্রভাব খাটিয়ে পুরো জমিটি জবরদখল করে নেন। যেহেতু এটি বনের জমি এবং কারো নামে বৈধ কাগজপত্র নেই, তাই ‘জোর যার মুলুক তার’—এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই পুরো ঘটনাটি ঘটায় তারা।
জমি দখলে নেওয়ার পর নুরুল হক ও তার ছেলে সেখানে প্রায় ১৮০টি দোকানঘর নির্মাণ করে অবৈধভাবে ভাড়া আদায় করছেন। মাসে লাখ লাখ টাকা ভাড়া তুললেও প্রকৃত মালিকদের কোনো অংশ প্রদান না করে দীর্ঘদিন ধরে তাদের বঞ্চিত করে আসছেন। এভাবেই বর্ণনা ছিল লিখিত অভিযোগে।
অভিযোগ তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার এস আই রিপনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগ পেয়েছি তদন্ত চলছে, উভয়পক্ষকে থানায় ডাকানো হয়েছে। বিষয়টা সামাধানের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেই নুরুল হক সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর ছত্রছায়ায় থেকে সংশ্লিষ্ট জমিটি এককভাবে দখল করে নেন। তার বিরুদ্ধে অতীতে ডাকাতি, হামলা ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সহায়তায় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের নাশকতা বিরোধী একটি মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়েছে, যার মামলা নং,জি আর উখিয়া (১৮/১১)২৫। এ পরিস্থিতিতে নুরুল হকের পুনরায় জমি দখলের প্রচেষ্টা ও তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো নিয়ে এলাকায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধান ও তথ্যসূত্র বলছে, অভিযুক্ত নুরুল হক ও তার ছেলে সালাহ উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নুরুল হক মূল দলে সক্রিয় থাকলেও সেই সময়ে সালাহ উদ্দিন ছিলেন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। রাজনৈতিক পরিচিতি ও স্থানীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সালাহ উদ্দিন পরে আব্দুর রহমান বদির সুপারিশপত্র ব্যবহার করে পুলিশ কনস্টেবলে চাকরি নেন—যা এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
চাকরিতে প্রবেশের পর থেকে তাদের প্রভাব আরও বেড়ে যায়। সেই সুযোগে এলাকায় মাদক কারবার, ভূমি জবরদখল, ভয়ভীতি দেখানোসহ একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন তারা। এমনকি নুরুল হকের স্ত্রীও এক মামলায় কারাভোগ করেছেন বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, নুরুল হকের ছেলে সালাহ উদ্দিন পুলিশের চাকরির সুবাদে নিয়মিত বাড়িতে আসা–যাওয়া করেন। পুলিশের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এই আসা–যাওয়ার সুযোগকে ব্যবহার করে তিনি নাকি ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বহন করেন—এমন কথাও এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কেউ কেউ আরও অভিযোগ করে বলেছেন, সালাহ উদ্দিনের প্রভাব ও পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নুরুল হক পরিবারটি এলাকায় একটি অঘোষিত আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
জমিদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা জমির উদ্দিন বলেন, নুরুল হকের পৈতৃকভাবে কোনো সম্পদই ছিল না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সে কীভাবে কোটি টাকার মালিক হলো,এটাই এখন মানুষের মুখে বড় প্রশ্ন ঘুরপাকে আছে।
তিনি আরো বলেছেন, নুরুল হক তার ছেলে পুলিশ কনস্টেবল সালাহ উদ্দিনকে ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারের মতো অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। সালাহ উদ্দিনের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত নিয়েও সন্দেহ আছে। এই যাতায়াতের আড়ালেই মাদক পাচারের রুট পরিচালিত হয় এমন মন্তব্যেও করেন তিনি। নুরুল হকের পরিবারের একাধিক সদস্য অতীতে ইয়াবাসহ মাদক সংশ্লিষ্ট মামলায় জেল খেটেছে। এখনও বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা চলমান। সালাহ উদ্দিনের চলাফেরা, যাতায়াত এবং তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মহলের গতিবিধি যাচাই করলে নুরুল হকের অবৈধ সম্পদ ও মাদক ব্যবসার সম্পূর্ণ চিত্র বেরিয়ে আসবে।
একই এলাকার বাসিন্দা নজু মিয়া অভিযোগ করে বলেন, নুরুল হকের বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে এবং এলাকায় অনেকেই তাকে ‘নুরুল হক ডাকাত’ নামে চেনেন।
নুরুল হকের ছেলে সালাহ উদ্দিন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন বলেই পুলিশের চাকরি পেতে সুবিধা পেয়েছেন। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন।
সালাহ উদ্দিনের চাকরির নথিপত্র খুঁজলে তার ছাত্রলীগের প্যাড ব্যবহার করার প্রমাণ মিলবে।
এসব বিষয়ে অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবল সালাহ উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মাদকের ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, বনের জমি আমার নামে দিয়েছিল ঠিক এসব আমি পুলিশ হওয়ার আগে। এখন নই। আমার পরিবারের বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমি ছাত্রলীগ ছিলাম না। বাবা আওয়ামীলীগ করেনি। তাহলে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে নাশকতা মামলায় আপনার বাবা আসামি কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন এসব ষড়যন্ত্রের একটি অংশ।
সালাহ উদ্দিনের বাবা অভিযুক্ত নুরুল হকের সাথে যোগাযোগ করা করে তিনি আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে নাশকতা মামলায় আসামি হওয়ার স্বীকার করে বলেন, আমি কারো জমি জবরদখল করিনি। বনের প্লট দিয়েছিল আমার ছেলেকে। এটাতে আমি দোকান নির্মাণ করেছি।