যে মা একদিন চার ছেলেকে স্বপ্নের পথে বিদায় দিয়েছিলেন, আজ সেই মা চার ছেলেকে বিদায় দিলেন চিরতরে- একসঙ্গে, পাশাপাশি চারটি কবরে।
বুধবার (২০ মে) চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বন্দেরাজারপাড়ায় সকাল থেকে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে অসহনীয় শোকে।
ওমানের মুলাদ্দায় এসির বিষক্রিয়ায় একই রাতে প্রাণ হারানো চার সহোদর- রাসেদুল ইসলাম (৪০), শাহেদুল ইসলাম (৩২), সিরাজুল ইসলাম (২৮) ও শহিদুল ইসলামের (২২) মরদেহ যখন দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ির উঠানে এসে থামে, তখনও ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। সময় তখন সকাল সাড়ে ৬টা।
অ্যাম্বুলেন্স থামতেই শুরু হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মা ছুটে আসেন ছেলেদের কাছে। যে মা চার ছেলেকে বুকে আগলে বড় করেছেন, সেই মায়ের আহাজারিতে ভেঙে পড়েন উপস্থিত সবাই। স্বজনদের কান্না আর বুকফাটা আর্তনাদে পুরো গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে যায়।
চট্টগ্রামসহ আশপাশের এলাকা থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসেন শেষবারের মতো চার ভাইকে একনজর দেখতে। উঠান থেকে শুরু করে আশপাশের পথঘাট ভরে ওঠে শোকার্ত মানুষে।
গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশ রাঙ্গুনিয়া উপজেলা উত্তরের সদস্যরা ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী চার ভাইয়ের শেষ গোসল সম্পন্ন করেন। এরপর একে একে চারটি খাটিয়া ঘরে ঢুকিয়ে আবার বের করা হয়- শেষবারের মতো। যে ঘরে একদিন চার ভাই একসঙ্গে ঘুমিয়েছেন, হেসেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন, সেই ঘর থেকে তাদের শেষ বিদায়ের দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি কেউ।
বেলা ১১টায় হোসনাবাদ লালানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় চার সহোদরের জানাজা। জানাজায় ইমামতি করেন পরিবারের একমাত্র জীবিত ভাই মাওলানা মো. এনাম।
ভাবুন সেই মুহূর্তের কথা- যে ভাই ইমাম হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তার পেছনেই শায়িত চার ভাই, চারটি কফিনে।
জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতারাও শোক প্রকাশ করেন।
জানাজা শেষে বন্দেরাজারপাড়া জামে মসজিদসংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে চার ভাইকে দাফন করা হয় পাশাপাশি চারটি কবরে। যারা একসঙ্গে বেঁচেছিলেন, একসঙ্গে প্রবাসে গিয়েছিলেন, একসঙ্গে চলে গেলেন, মাটির নিচেও রয়ে গেলেন পাশাপাশি।
চার কফিন। দুটি অ্যাম্বুলেন্স। এক জানাজা। চারটি কবর। আর একটি মা- যার বুক আজ শূন্য।
প্রবাসের মাটিতে স্বপ্ন বুনতে গিয়ে যে চার ভাই আর ফিরতে পারলেন না, তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন এলাকাবাসী। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানানো হয়েছে গভীর সমবেদনা।