পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে সন্তানের মৃত্যুর ১৫ দিনেও আটক হয়নি মূলহোতা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, যাকে পালাতে সহায়তার অভিযোগ আছে পুলিশের বিরুদ্ধেই। মামলার তদন্তেও ধীরগতি। অসহায় মা ছালমা বেগম তাই গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় নেমে এলেন রাজপথে, যে পুলিশ ফাঁড়ির নির্যাতনে মৃত্যু হয় রায়হানের, সেটির সামনেই কাফনের কাপড় গায়ে চাপিয়ে জানালেন- অপরাধীরা গ্রেপ্তার না হলে থাকবেন আমরণ অনশনে। যদিও বিকাল ৫টায় সিটি মেয়র ও গণ্যমান্যদের অনুরোধে সেই অনশন তুলে নেন রায়হানের মা। অনশন ভাঙাতে গিয়ে সঠিক বিচার না হলে সবাইকে নিয়ে রাজপথে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী।

ছালমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সন্তানকে হত্যা করে পুলিশের বড় কর্তাদের সামনে দিয়ে পালিয়ে গেল আকবর। আমাদের প্রশাসন অনেক দক্ষ, নিশ্চয়ই তারা জানে আকবর কোথায়, কিন্তু ধরছে না। অন্য দোষীদেরও রাখা হয়েছে জামাই আদরে। তাদের একসঙ্গে গ্রেপ্তার না করে একজন একজন করে আদালতে এনে সময় নষ্ট করা হচ্ছে। কয়দিন পর সবাই এ ঘটনা ভুলে যাবে। আমি ডেকেও কাউকে আর পাব না। সন্তানকে পেলাম না, হয়তো সন্তান হত্যার বিচারও দেখে যেতে পারব না। এর চেয়ে রাস্তায় বসে মরে যাওয়াই ভালো।

রায়হান উদ্দিন নামের ওই যুবককে বন্দরবাজার থানাপুলিশ গত ১০ অক্টোবর আটক করে। ওইদিন রাতে ফাঁড়িতে তার ওপর নির্যাতন চালায় পুলিশ এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য টাকা দাবি করে। ছেলেকে বাঁচাতে ভোরে তার বাবা টাকা নিয়ে ওই ফাঁড়িতে গেলে জানানো হয় রায়হান এখন ঘুমাচ্ছে, সকাল ১০টার দিকে আসতে হবে। পরে সকাল ১০টার দিকে গেলে তাকে বলা হয়, সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে যেতে। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন তার ছেলে মারা গেছে। পুলিশ দাবি করে, ছিনতাইকারী সন্দেহে রায়হানকে জনতা গণপিটুনি দেওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। যদিও সিটি করপোরেশনের ফুটেজে এর কোনো প্রমাণ মেলেনি। এ ঘটনায় সিলেট কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। মহানগর পুলিশের ওপর ব্যাপক অভিযোগের পর মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। তবে ‘তদন্তের স্বার্থে’ কোনো বিষয়েই মুখ খুলছেন না দায়িত্বপ্রাপ্তরা। কাকে কখন আদালতে আনা হচ্ছে বা রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে তথ্য দিতেও অপারগতা জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক মহিদুল ইসলাম।

ঘটনার মূলহোতা আকবর এখন পর্যন্ত ধরা না পড়ার সুযোগ নিচ্ছেন গ্রেপ্তারকৃতরা। কিছুতেই মুখ খুলতে চাইছেন না তারা। নির্যাতনে অংশ নেওয়া কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাসকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েও অর্থবহ কিছু উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে পিবিআই। রিমান্ড শেষে গতকাল রবিবার আদালতে আনা হলে সেখানে জবানবন্দি দিতে রাজি হননি টিটু। বাধ্য হয়ে তাকে আরও তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে আছেন কনস্টেবল হারুনুর রশীদও। পিবিআইয়ের কাছে টিটুর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে অনেক গরমিল ঘটনার দিন ফাঁড়িতে অবস্থানকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী তিন কনস্টেবল শামীম, সাইদুর ও দেলোয়ারের বক্তব্যে।

এদিকে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত এবং তিনজনকে প্রত্যাহারের বাইরে এ মামলায় এখন পর্যন্ত টিটু ও হারুনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া রায়হানের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগ তোলা সাইদুর রহমানকেও আটকের কথা স্বীকার করেছে পিবিআই। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক মহিদুল ইসলাম জানান, রায়হানের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগ আনা সাইদুর রহমানকে রবিবার সকালে পিবিআই অফিসে নিয়ে আসা হয়। এর পর বিকালে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

১০ অক্টোবর মধ্যরাতে সাইদুর রহমান বন্দরবাজার এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে জানান, তিনি কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। তার অভিযোগ পেয়েই রাত আড়াইটার দিকে কাষ্টঘর থেকে রায়হানকে তুলে নিয়ে আসে পুলিশ।