২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে নয়ন ও তার সহযোগী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে গুরুতর আহত করে এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রিফাত শরীফ মারা গেলে রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার দায়ে গ্রেফতার করা হয় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে।

১৯ জুলাই বরগুনার আদালতের বিচারক সিরাজুল ইসলাম গাজীর খাসকামরায় হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি।

মিন্নির সেই জবানবন্দী পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:

আমি বরগুনা সরকারী কলেজে বিবিএ প্রথম বর্ষে পড়ালেখা করি। আমি ২-১৮ সালের বরগুনা সরকারী কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করি। আইডিয়াল কলেজে পড়াশোনা করাকালীন আমার প্রথম প্রেমের সম্পর্ক হয়। ওইসময় রিফাত শরীফ বামনা ডিগ্রি কলেজের ছাত্র ছিল। রিফাত শরীফ ও নয়ন বন্ড পরস্পর বন্ধু ছিল। রিফাত শরীফ আমাকে তার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় তারমধ্যে নয়ন বন্ড একজন। কলেজে যাওয়া আসার কালে নয়ন বন্ড আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে জ্বালাতন করতো। আমি তার প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় সে আমার চাচা ও ছোট ভাইকে ক্ষতি করার ভয় দেখাতো। বিষয়টি আমি রিফাত শরীফকে জানাইনি। আমি রিফাত শরীফকে ভালবাসতাম। কিন্তু রিফাত শরীফ অন্য মেয়েদের সাথে সম্পর্ক করার কিছু বিষয় আমি লক্ষ্য করি। এবং একারণে রিফাত শরীফের সাথে আমার সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটে। আমি ধীরে ধীরে নয়ন বন্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ি। নয়ন বন্ডের সাথে আমার প্রেমেরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি নয়নের মোবাইল নম্বরে আমার মায়ের মোবাইল নম্বর ০১৭১৯৬…….. এবং নয়নের দেয়া নম্বর শেষে ………৬১১৩ ও অন্য একটি নম্বর দিয়ে নয়নকে কল ও মেসেজ করতাম। ফেসবুক মেসেঞ্জারে কল দিতাম। বরগুনা সরকারী কলেজে পড়াশোনাকালীন ধীরে ধীরে রিফাত ফরাজী, রিফাত হাওলাদার ও রাব্বী আকনের সাথে আমার পরিচয় হয়। রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল প্রেমের সম্পর্কের কারণে নয়ন বন্ডরে বাসায় আমার যাতায়াত ছিল। নয়নের বাসায় দুজনের শারীরিক সম্পর্কের কিছু ছবি-ভিডিও নয়ন গোপনে ধারণ করে। যা আমি প্রথমে জানতাম না। নয়নের বাসায় আমি প্রায় যেতাম। আমাদের শারীরিক সম্পর্ক চলতে থাকে। এরপর গত ১৫-১০-২০১৮ আমি রোজী আন্টির বাসায় যাওয়ার পথে বিকাল বেলা ব্যাংক কলোনি থেকে নয়ন বন্ড রিকসাযোগে আমাকে তার বাসায় নিয়ে যায়। নয়নের বাসায় যেয়ে আমি শাওন, রাজু, রিফাত ফরাজীসহ আমি ৭-৮জনকে দেখি। শাওন বাইরে এসে কাজী ডেকে আনে। এবং নয়নের বাসায় আমার ও নয়নের বিয়ে হয়। তারপর আমি বাসায় চলে যাই। বাসায় যেয়ে নয়নকে ফোন করে বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে বলি। তখন নয়ন বলে, এটা বালামে ওঠে নাই। বালামে না উঠলে বিয়ে হয় না। এরপরও আমি নয়নের সাথে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখি। নয়নের সাথে বিয়ের বিষয়টি আমার পরিবারের কেউ জানে না। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে কলেজ থেকে পিকনিকে কুয়াকাটায় যাওয়ার বাস আমি তখন মিস করি। তখন নয়নের মোটর সাইকেলে আমি কুয়াকাটায় যায়। নয়নের সাথে একটি হোটেলে রাত্রি যাপন করি। আমি নয়নের বাসায় আসা যাওয়াকালে একসময় জানতে পারি নয়ন মাদকসেবী, ছিনতাই করে এবং তার নামে থানায় অনেক মামলা আছে। একারণে নয়নের সাথে আমার সম্পর্ক অবনতি হয়। এবং রিফাত শরীফের সাথে আমার আগের ভালবাসার সম্পর্ক আবার শুরু হয়। গত ২৬-০৪-২০১৯ তারিখ পারিবারিকভাবে রিফাত শরীফের সাথে আমার বিয়ে হয়। রিফাত শরীফের সাথে বিয়ের পরও নয়নের সাথে আমার দেখা-সাক্ষাত, শারীরিক সম্পর্ক, মোবাইলে কথাবার্তা-মেসেঞ্জারে যোগাযোগ সবই চলতো। বিয়ের পর জানতে পারি রিফাত শরীফ মাদকসেবী। সে মাদকসহ পুলিশের নিকট ধরা খায়। বিষয়টি জানতে পেরে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। পরে আমি রিফাতসহ আমার বাবার বাসায় থাকতাম। মাঝে মাঝে রিফাত শরীফের বাসায় যেতাম। নয়ন বন্ডের বিষয় নিয়ে রিফাত শরীফের সাথে আমার মাঝে কথা কাটাকাটি হতো এবং রিফাত শরীফ আমার গায়ে হাত তুলতো।
গত ২৪-০৬-২০১৯ তারিখ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নয়ন বন্ড আমাকে ফোন দিয়ে বলে তোর স্বামী হেলালের ফোন ছিনাইয়া নিছে। পরে রিফাত ফরাজীও আমাকে ফোন দিয়ে বলে হেলালের ফোনটি রিফাতের কাছ থেকে নিয়ে হেলালকে ফেরত দিতে। আমি রিফাত শরীফকে হেলালের ফোন ফেরত দিতে বললে, রিফাত শরীফ আমাকে চড়-থাপ্পড় মারে, তলপেটে লাথি মারে। রাতে মোবাইল ফোনে নয়নকে জানাই, এবং কান্না করি। এরপর ২৫-০৬-২০১৯ তারিখ আমি কলেজে গিয়ে নয়নের বাসায় যাই। রিফাত শরীফকে একটা শিক্ষা দিতে হবে, একথা নয়নকে বললে, নয়ন বলে হেলালের ফোন নিয়ে যে ঘটনা তাতে রিফাত ফরাজী তাকে মারবে। তারপর আমি বাসায় চলে আসি। এবং রাতে এ বিষয়ে কয়েকবার আমার নয়ন বন্ডের সাথে মোবাইলে কথা হয়। নয়ন বন্ডের সাথে আমার স্বামী রিফাত শরীফকে মাইর দিয়া শিক্ষা দিতে হবে এই পরিকল্পনা করি। ২৬-০৬-২০১৯ তারিখে আমি কলেজ যাই এবং সায়েন্স বিল্ডিং এর পাশে বেঞ্চের উপরে রিফাত ফরাজী ও রাব্বী আকনকে বসা পাই। রিফাত হাওলাদার পাশে দাঁড়ানো ছিল। তখন আমি রিফাত ফরাজীর পাশে বসি এবং তাকে বলি ”ওকি ভাইটু, খালি হাতে আসছ কেন?” একথার উত্তরে রিফাত হাওলাদার বলে, ওকে মারার জন্য খালি হাতই যথেষ্ট। এর রিফাত ফরাজীকে জিজ্ঞাসা করি নয়ন বন্ড ও রিফাত শরীফ কলেজে এসেছে কি না। তখন নয়ন বন্ড আমাকে ফোন দেয়, সে কোথায় এটা জানতে চাইলে নতুন ভবনের দিকে যতে বলে এবং ওই সময় নয়ন ভবনের দেয়াল টপকাইয়া ভিতরে আসে। আমি হেটে নতুন ভবনের দিকে যাই। এবং নয়নের সাথে রিফাত শরীফকে মারপিট করার কথা বলি। এরপর রিফাত শরীফ কলেজের ভিতর আমাকে নিতে আসে এবং আমাকে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য কলেজ থেকে বের হয়ে মোটর সাইকেল করে আমার কাছে আসে। কিন্তু আমি তাতে না উঠে সময়ক্ষেপণ করার জন্য পুনরায় কলেজ গেটে আসি। রিফাত শরীফ আমার পিছন পিছন ফিরে আসে। তখন রিশান ফরাজী কিছু পোলাপান সাথে এনে রিফাত শরীফকে জিজ্ঞাসা করে তুমি আমার বাবা-মাকে গালি দিয়েছো কেন? তখন রিফাত শরীফ তাদের বলে আমি গালি দেইনি। ঐসময় রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে কলার ধরে এবং রিশান ফরাজী জাপটে ধরে। রিফাত ফরাজী, টিকটক হৃদয়, রিশান ফরাজী, রিফাত হাওলাদার আরও অনেকে রিফাত শরীফকে পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মারধর করতে করতে টেনে হিচড়ে ক্যালিক্স একাডেমীর দিকে নিয়ে যায়। তারা এসময়ে এলাপাতাড়িভাবে মারধর শুরু করে। আমি তখন ধীরে ধীরে হেটে যাচ্ছিলাম। তখন নয়ন বন্ড এসে রিফাত শরীফকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। মারপিটের ভিতর রিফাত ফরাজী, হৃদয় ২টা দা নিয়ে আসে দৌড়ে। রিফাত হাওলাদার লাঠি আনে। ১টি দা নয়ন বন্ড আরেকটি দা রিফাত ফরাজী নিয়ে রিফাত শরীফকে কোপাইতেছিল। এসময় রিশান ফরাজী রিফাত শরীফকে ঝাপটে ধরেছিল যাতে সে পালাতে না পারে। কোপাইতে দেখে আমি তখন নয়ন বন্ডকে আটকাতে চেষ্টা করি। রিফাতের শরীর তখন রক্তাক্ত হয়ে যায়, সে পুব দিকে হেটে যায়। আমি তখন তাকে রিকসা করে বরগুনা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসি। আমার বাবা-চাচা হাসপাতালে আসে। রিফাত শরীফকে বরিশাল পাঠানো হয় আর আমার গায়ে রক্ত লেগে যাওয়ায় আমি বাসায় ফিরে আসি। পরে আমি জানতে পারি রিফাতে অবস্থা খারাপ। এটা আমি ফোন করে বলি নয়ন বন্ডকে বলি তোমরা ওকে যেভাবে মারছো তাতে সে মারা যাবে আর তোমরা আসামি হবা। তারপর নয়নের অবস্থান জানতে চাই। তারপর ওকে পালাতে বলি। দুপুরের পর খবর পাই রিফাত শরীফ মারা গেছে।