সামরিক নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পক্ষে ভূমিকা না রেখে মিয়ানমারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে সহায়তা প্রদানকারী দেশগুলোর সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগান।
বৃহস্পতিবার বিকালে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে আলোচনায় কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করেই তিনি বলেন, কিছু দেশ রয়েছে মিয়ানমারকে লালন-পালন করছে, যারা বিতাড়নের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থেকেছে।

তিনি বলেন, যদি কোনো সমালোচনা করতে হয় তাহলে আমি তাদের সমালোচনা করব যারা মিয়ানমারকে সামরিক ও অন্যান্য রাজনৈতিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে বিগান বলেন, বাংলাদেশের দিক থেকে যৌক্তিক প্রত্যাশা রয়েছে অন্যান্য দেশও এই ভার মোকাবেলায় কিছু ভূমিকা ও দায়িত্ব নিক।

২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে বাংলাদেশে ছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা।

গত বছর দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাখাইন রাজ্যের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরে ফিরতে রাজি হননি রোহিঙ্গারা।

এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সরকার মেয়াদে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদের কর্মকর্তা হিসেবে সফরে আসেন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিগান। স্বাভাবিকভাবে তার সফরে ঘুরে ফিরে এসেছে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় আমেরিকার ভূমিকার কথা।

বৃহস্পতিবার বিগান সৌজন্য সাক্ষাতে গেলে রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজের দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এর আগে সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান বিগান।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে সব দেশের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার উপর গুরুত্ব আরোপ করতে চাই আমি। এটা কেবল বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব নয়, বৈশ্বিক অগ্রাধিকার।

বিগান বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সব দেশের উচিত সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমার যাতে উদ্যোগী হয়, সেজন্য সমানভাবে স্পষ্টভাষী হওয়া।

এর আগে তিন দিনের সফরে বুধবার বিকালে ঢাকায় পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিভেন বিগান। রাতে ঢাকার একটি হোটেলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। সেখানে মহামারী পরবর্তী সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অংশ হিসাবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়।

বৃহস্পতিবার সকালে ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেন বিগান। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

বিকালে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভেন্টিলেটর ও গ্যাস এনালাইজার হস্তান্তর সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর সীমিত পরিসরে এক সংবাদ সম্মেলণে ঢাকা সফর নিয়ে আলাপ করেন তিনি।

তিনি বলেন, অবশ্যই আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আইপিএস নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে একে অপরকে সহযোগিতা করার বিশাল সুযোগ রয়েছে।

বিগান বলেন, “এটি শুধু নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পর্ক নয়। এটি সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সম্পর্ক। গণতান্ত্রিক একটা পরিবেশের মধ্যে এই অঞ্চলের দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতায় এর মাধ্যমে এগিয়ে আসতে পারে।”

বাংলাদেশের বিষয়ে আগ্রহী হওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে বিগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক আগ্রহের জায়গাটি হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বড় একটি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে আকর্ষণের জায়গা তৈরি করেছে। এটি ভূরাজনীতির বাইরে।

বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন কোনো বিষয় নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, গত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের আগে দুর্যোগের মতো অভ্যন্তরীণ কিছু সংকট ছিল।
আর আজকে বাংলাদেশকে দেখছি বড় সময় ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। বড় সময় ধরে রাজনৈতিক স্থীতিশীলতা। এগুলো আরও গভীর সম্পর্কের দরজা খুলে দিয়েছে।