কক্সবাজারের চকরিয়ায় গরু চুরির অপবাদে মা-মেয়েকে রশিতে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রবিবার রাতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল সোমবার বিকালে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। এ ছাড়া মা-মেয়ের জামিন মঞ্জুর করেছেন চকরিয়ার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

অন্যদিকে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার পর বেরিয়ে আসছে হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মিরানুল ইসলাম মিরানের নানা অপকর্ম। তার বিরুদ্ধে সালিশবৈঠকে নাম করে বিভিন্ন সময় মানুষকে মারধরের অভিযোগ পুরনো। এমনকি চেয়ারম্যান নিজ হাতে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন একজনকে। ওই ঘটনায় চেয়ারম্যান মিরানসহ দুজনকে আসামি করে কক্সবাজার আদালতে একটি হত্যা মামলা হয়েছে। মামলাটি এখনো বিচারাধীন

রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী চেয়ারম্যানের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনি।

এদিকে মা-মেয়েকে রশিতে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় নজর রাখছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নির্যাতনের বিষয়ে তদন্তে গাফিলতি হলে আদালত তাতে হস্তক্ষেপ করবেন। ওই ঘটনার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনলে গতকাল সোমবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন। বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেসমিন সুলতানা। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী এএম জামিউল হক ফয়সাল। পরে আদালতের মন্তব্যের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন আইনজীবী জেসমিন। এ ছাড়া নির্যাতন ও মারধরের ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি।

জানা গেছে, গরু চুরির অপবাদে রশি দিয়ে বেঁধে মা-মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে টনক নড়ে প্রশাসনের। এর পর রবিবার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেনের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এতে জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখার পরিচালক (উপসচিব) শ্রাবস্তী রায়কে প্রধান করা হয়। অন্য দুই সদস্য হলেন চকরিয়া সহকারী কমিশনার ভূমি তানভীর হোসেন ও হারবাং ইউনিয়নের একজন ট্যাগ অফিসার।

অন্যদিকে চকরিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক গরু চুরির অপবাদে মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে নির্যাতনের ঘটনাটি আমলে নিয়ে ঘটনাটি তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মো. মতিউল ইসলামকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে ঘটনাটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন।

তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন…

মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে রশি দিয়ে বেঁধে মারধরের ঘটনায় জেলা প্রশাসন গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত টিম কাজ শুরু করেছে। স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (উপসচিব) শ্রাবস্তী রায়ের নেতৃত্বে তদন্ত টিম সোমবার দুপুরে হারবাং ইউনিয়নের ঘটনাস্থলসমূহ পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

তবে কমিটির আরেক সদস্য চকরিয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানভীর হোসেন বলেন, ঘটনার সময় উপস্থিত মেম্বার- চৌকিদারদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বেশ কয়েকজনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আর কিছু বলা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে ইউএনও সৈয়দ শামসুল তাবরীজের নেতৃত্বে আরেকটি তদন্ত কমিটি মাঠে কাজ করছে। রবিবার বিকালে ইউএনও সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। তিনিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মা ও দুই মেয়ের জামিন

গরু চুরির মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে মা-মেয়েসহ তিনজনকে জামিন দিয়েছেন আদালত। সোমবার সকালে চকরিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক রাজিব কুমার দেব এই জামিন দেন।

জামিনপ্রাপ্তরা হলেন- চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কুসুমপুর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের আবুল কালামের স্ত্রী পারভীন আক্তার, তার মেয়ে সেলিনা আক্তার ও রোজিনা আক্তার।

চকরিয়া আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক বলেন, রবিবার সন্ধ্যায় ঘটনাটি তুলে ধরে চকরিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিদের জামিন প্রার্থনা করেন অ্যাডভোকেট ইলিয়াস আরিফের নেতৃত্বে একদল আইনজীবী। এ সময় আদালতের বিচারক আসামিদের আদালতে উপস্থিত করার নির্দেশ দেন। পরে পুলিশ সোমবার সকালে পারভীন আক্তার ও সেলিনা আক্তারকে আদালতে উপস্থিত করেন। এ সময় আদালত মা-মেয়েসহ তিনজনকে জামিন দেন। অন্য দুই আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।

নির্যাতনের ঘটনায় তিনজন কারাগারে

মা-মেয়েসহ পাঁচজনকে রশি দিয়ে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল তাদের কারাগারে পাঠান আদালত। তারা হলেন- গরু চুরির মামলার বাদী মাস্টার মাহমুদুল হকের ছেলে নজরুল ইসলাম, একই এলাকার ইমরান হোসেনের ছেলে জসিম উদ্দিন ও জিয়াবুল হকের ছেলে নাছির উদ্দিন।

চকরিয়া থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ঘটনার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে হারবাং এলাকা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

মারধর চেয়ারম্যানের পুরনো অভ্যাস

হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মিরানুল ইসলাম মিরানের বিরুদ্ধে সালিশবৈঠকে বিভিন্নজনকে মারধরের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের ৪ মে হারবাং শাহ সুফি মাজারের খাদেম মো. ফয়েজ আহমদকে সালিশবৈঠকের নামে বাড়িতে ডেকে মারধর করেন তিনি।

মৃত খাদেম মো. ফয়েজ আহমদের ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহান শাহ বলেন, আমার বাবাকে বাড়িতে ডেকে চেয়ারম্যান মিরান নিজ হাতে লাঠি দিয়ে পেটান। এর পর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানসহ দুজনকে আসামি করে কক্সবাজার আদালতে একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

হারবাং লাল ব্রিজ এলাকার গিয়াস উদ্দিন, সোহেল উদ্দিন, ৭নং ওয়ার্ডের রাশেদ ওরফে কালো ড্রাইভারকে সালিশবৈঠকের নামে মারধর করেন। এ ছাড়া গত ২০১৯ সালের নভেম্বরে হারবাং স্টেশনে দেলোয়ার হোসেন নামে মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবককে মারধরের অভিযোগও রয়েছে। এ রকম অনেককে সালিশবৈঠকের নামে যখন-তখন গায়ে হাত তুলতেন চেয়ারম্যান। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় কেউ সাহস করে মুখ খুলতেন না।