রোহিঙ্গাদের ৪০ জনের একটি দল এখন ভাসানচরে৷ সেখানে এক লাখ রোহিঙ্গাকে সরিয়ে নিতে চায় বাংলাদেশ সরকার৷ তার আগে ভাসানচরের সার্বিক পরিস্থিতি দেখিয়ে আনতেই ৪০ জন রোহিঙ্গাকে নেয়া হয়েছে সেখানে৷

৪০ জনের এই দলে দুজন নারীও আছেন৷ তাদের শনিবার বিকালে (৫ সেপ্টেম্বর) ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হয়৷ আগামীকাল মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) তাদের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ফিরে যাওয়ার কথা৷

ভাসানচরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে দুজনের সঙ্গে কথা হয়েছে বার্তা সংস্থা ডয়চে ভেলের৷ তারা এখনো ভাসানচরে আছেন৷ সেখানে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বেশ ভালো৷ ভাসানচরে বসে তারা যাতে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন সেজন্য তাদের মোবাইল ফোন সঙ্গে নিতে দেয়া হয়েছে৷

তাদের একজন মোহাম্মদ নূর জানান, নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাদের সেখানে নেয়া হয়েছে৷ সঙ্গে শরণার্থী কমিশনের লোকজনও আছেন৷ তাদের ভাসানচরের সুযোগ-সুবিধা দেখানোই এই সফরের উদ্দেশ্য৷ তিনি বলেন, ‘প্রতি আটটি পরিবারের থাকার জন্য একসঙ্গে এক রুমের আটটি করে পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে৷ এই আটটি পরিবারে জন্য কমন টয়লেট ও রান্নাঘর আছে৷’

এছাড়া ‘টিউবওয়েল আছে, ডাক্তারখানা আছে, স্কুল আছে, পুলিশ ক্যাম্প আছে, বড় বড় পুকুর আছে, মহিষ আছে; যাতে বন্যার পানি না ঢুকতে পারে সেজন্য চারপাশ থেকে বাঁধ দেয়া আছে’ বলেও জানান তিনি৷ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক দালান দেখলাম, অফিস দেখলাম, সাইক্লোন সেন্টার দেখলাম৷ এটা অনেক বড় জায়গা৷ আমাদের ঘুরিয়ে দেখানো হচ্ছে৷ খাবার-দাবার ভালোই দিচ্ছে৷ আর মহিষ পালনের ব্যবস্থা আছে৷ মাছ ধরার ব্যবস্থা আছে৷’

সেখানে কোনো কাজের ব্যবস্থা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষ আসলে কাজের ব্যবস্থা হবে, এখন নাই৷’

যারা আগে থেকে ভাসানচরে আছেন তাদের সঙ্গেও দেখা হয়েছে মোহাম্মদ নূরের ৷ নূর জানান, ‘তারা কান্নাকাটি করছে৷’ কেন কান্নাকাটি করছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে তারা বিচ্ছিন্ন আছেন৷ বাবা-মা নাই৷ তাই তারা এভাবে থাকতে চাচ্ছেন না৷’

কেমন লেগেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখান থেকে ক্যাম্পে গিয়ে তিন দিন পর তার কেমন লাগলো তা তিনি জানাবেন৷ তার আগে নয়৷

যা দেখছেন তাতে তিনি নিজে কক্সবাজারের ক্যাম্প ছেড়ে ভাসানচর যাবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তা তো এখন বলা যাবে না৷’

আরেকজন রোহিঙ্গা শরণার্থী নেতা মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, ভাসানচরে তার অনেক কিছুই ভালো লেগেছে৷ কিন্তু কক্সবাজারের ক্যাম্প ছেড়ে স্থায়ীভাবে ভাসানচরে যাবেন কি না জানতে চাইলে তিনিও বলেন, ‘সেটা তো এখনই বলা যাচ্ছে না৷ ফিরে গিয়ে পরিবারের সাথে আলাপ করি৷ সবার সাথে কথা বলি তারপর দেখব৷’

তিনিও মোহাম্মদ নূরের মতোই সেখানকার থাকার ব্যবস্থাসহ অন্যান্য স্থাপনার বর্ণনা দেন৷ তবে তিনি বলেন, ‘এখানো কোনো খাবার নাই৷ লোকজন এলে বাইরে থেকে খাবার আনতে হবে৷’

তিনি জানান, কাজের জন্য এখানে আমাদের খেত-খামার দেখানো হয়েছে, মহিষ, গরু ছাগল আছে৷ মাছের চাষ আছে৷ ভালোই মনে হয়েছে৷ সবাই আসলে তখন ভালো হবে৷ তার আগে তো বলা যায় না৷

ভাসানচরে আগে ৩০৬ জন রোহিঙ্গাকে নেয়া হয়েছে৷তাদের মধ্যে দুই শতাধিক নারী ও শিশু আছেন৷ তাদেরকে ক্যাম্পের বাইরে থেকে বা নৌকা থেকে উদ্ধার করে সেখানে নেয়া হয়৷

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ভাসানচরের অবস্থান৷ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে আশ্রয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে৷ জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সেখানকার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরি করেছে৷ এক লাখ রোহিঙ্গার বসবাসের জন্য ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে৷

হাতিয়ার সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমরা নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ভাসানচরের নিরাপত্তার কাজ করি৷ পুলিশের একটি ক্যাম্প আছে৷ আগে থেকেই যে ৩০৬ জন আছে, তাদের নিরাপত্তা দেয়াই আমাদের কাজ৷ তারা বেশ শান্ত এবং তাদের মধ্যে কোনো অপরাধ প্রবণতা আমরা এখনো দেখিনি৷’ সূত্র: ডয়চে ভেলে