মিয়ানমার থেকে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। এতে ওই উপজেলাগুলোর জনসংখ্যা দ্বিগুণ। ফলে বিদ্যমান অবকাঠামো, অপ্রতুল সামাজিক সেবা প্রদান ব্যবস্থা, সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যবিধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিদুর্ঘটনাসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা অতিমাত্রায় ঝুঁকিতে পড়েছে।

এ কারণে বিশ্বব্যাংক ও কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অনুদানের টাকায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ‘জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবিলায় মাল্টি-সেক্টর’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির প্রথম সংশোধন অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।

মূল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। তার মধ্যে সরকারের অর্থ ছিল ৯ কোটি ৫৬ লাখ এবং বিশ্বব্যাংক ও কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অনুদান ছিল ১ হাজার ৪৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আজকের সংশোধনীতে ৯১৯ কোটি ২ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে এখন প্রকল্পের মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। তার মধ্যে সরকার দেবে ২০ কোটি ৩৬ লাখ এবং বিশ্বব্যাংক ও কেএফডব্লিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অনুদান ১ হাজার ৯৬৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। সংশোধন করে এর মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের জন্য এ প্রকল্পে অর্থ বিশ্বব্যাংক অনুদান হিসেবে দিতে চায় না। ঋণ নিয়ে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের উন্নয়নে বাংলাদেশকে অর্থ খরচ করতে বলছে বিশ্বব্যাংক।

একনেক সভা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. জাকির হোসেন আকন্দ বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা টেবিলে আমি কথা বলেছি। তারা আমাদের অনুদান দিতে চায়নি। তারা বলেছে, বাংলাদেশ আর কোনোভাবেই অনুদান পাবে না। যেহেতু আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তারা ঋণ দেবে আমাদের। তারপর আমরা বলেছি, তাহলে আপনাদের সাথে আমাদের এটা শেষ সভা, আর কোনো সভা করবো না। যদি অনুদান নিয়ে আসতে পারেন তাহলে আমরা এটা গ্রহণ করবো। কারণ, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রেখেছি। এর বাইরে আমাদের ছয়টিসহ মোট আটটি উপজেলার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের সামাজিক ভ্যালু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, আবাসন নষ্ট হচ্ছে, পানির উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আপনারা জানেন গাছ কাটাও হচ্ছে। এ কারণে আমরা বলেছি, এই প্রকল্পটা রোহিঙ্গাদের কারণে নিয়েছি, বাংলাদেশের কারণে নয়। সুতরাং রোহিঙ্গাদের জন্য এই প্রকল্পের সবটা সরাসরি ব্যয় না হলেও রোহিঙ্গাদের কারণে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধানের জন্য এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সুতরাং অনুদান দিতে হবে।’

প্রকল্প সূত্র বলছে, প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়/স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর (ডিপিএইচই) বাস্তবায়ন করবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমানো, সামাজিক সেবা প্রদান ব্যবস্থার উন্নতি করা, সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করা, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমানো, শিক্ষার উন্নত সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার থেকে আগত আশ্রিতদের লিঙ্গভিত্তিক বলপ্রয়োগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

এ প্রকল্পের আওতায় ৫০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, ২২২.৯৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ৩৭১ মিটার সেতু নির্মাণ, ৪৬৭.৫ মিটার কালভার্ট নির্মাণ, ৩৪টি মাল্টিপারপাস কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, ৪২.১৫ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ, ৬৬টি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ মিনি পাইপ সরবরাহ, ৯০টি পরিচালন ও রক্ষাণাবেক্ষণসহ কমিউনিটি ল্যাট্রিন নির্মাণ, ৩০টি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ বায়ো গ্যাস ল্যাট্রিন নির্মাণ, ২ হাজার ৫০০টি ওয়াটার অপশন স্থাপন, ১৪ হাজার ৮০০টি বিদ্যমান টয়লেট সংস্কারসহ বাসা-বাড়িতে টয়লেট স্থাপন এবং ২ হাজার ৫০০টি বাসা-বাড়িতে বায়োফিল টয়লেট স্থাপন করা হবে।