মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর নতুন করে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শংকা দেখা দিয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত প্রায় ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ নিয়ে  উদ্বিগ্ন এপার-ওপারে থাকা তাদের স্বজনরা।

এ অবস্থায় রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের অনেকে এপারে পালিয়ে আসার জন্য রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা তাদের স্বজনদের কাছে নিয়মিত যোগাযোগ করে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ-খবরও নিচ্ছেন। মিয়ানমারের এমন পরিস্থিতিতে আবারো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শংকা বাড়ছে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের কাছে।

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত এনজিওগুলোরও তৎপরতা বেড়ে গেছে। বরাবরই অভিযোগ রয়েছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধার নেপথ্যে এনজিওগুলোরও বড় একটি ভূমিকা রয়েছে।

জানা গেছে, শিবিরে কর্মরত এনজিও কর্মীরা সীমান্ত এলাকায় আনা গোনা বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রত্যাবাসন বিরোধী কিছু রোহিঙ্গার আচার-আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। এসব নানা কারণে সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজনের কাছে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশংকা দেখা দিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশে সে দেশের সেনারা টহল বৃদ্ধি করেছে। সীমান্ত এলাকার লোকজন জানিয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্তে তুমবুরু ও ঘুংধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সেনা তৎপরতা বেড়েছে। সেনারা সীমান্ত এলাকায় বাংকার খনন করছে বলেও জানিয়েছে এপারের বাসিন্দারা। অপরদিকে  বাংলাদেশ সীমান্তেও বিজিবি টহল বৃদ্ধি করেছে। নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় বিজিবি টহল দিচ্ছে। গত তিন দিন  ধরে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী লোকজনও সতর্ক রয়েছে। তবে এসব বিষয় নিয়ে বিজিবি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছেন।

কক্সবাজারের উখিয়া- টেকনাফের শিবিরের রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থাকা রোহঙ্গারা সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে এপারে থাকা স্বজনদের কাছে খবরা খবর রাখছেন। এ কারণে শিবিরের রোহিঙ্গাদেরও শংকা, যদি কিনা সেদেশের পরিস্থিতি  দিকে গড়ায় তাহলে তারা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আবারো দলে দলে ঢুকে পড়তে পারে।

টেকনাফের শালবাগান শিবিরের মোহাম্মদ শওকত নামের একজন রোহিঙ্গা এ বিষয়ে বলেন- ‘মিয়ানমারের ভুসিডং এলাকায় আমাদের বসবাস ছিল। ২০১৭ সালের আগস্টে পরিস্থিতি খারাপ দেখে আমি আমার পরিবারকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু আমার চাচা, ভাইসহ অনেক আত্মীয়-স্বজন তখন থেকে ঝুঁকি নিয়ে সেখানে রয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, পরবর্তীতে সেখানে বসবাস করতে তাদের তেমন সমস্যা হয়নি। তবে গত   কয়েকদিন আগে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে তারা এখন খুব চিন্তায় পড়েছে। সেনা শাসনে তাদের ওপর নতুন করে কোন নিপীড়ন হবে কিনা তা নিয়েও তারা আতঙ্কে আছে।

রোহিঙ্গা মোহাম্মদ শওকত আরো বলেন, ওপারে থাকা আত্মীয় স্বজনরা বাংলাদেশে চলে   আসতে তাদের কাছে বার বার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে না নতুন করে কোনো রোহিঙ্গা আসলে দেশে ঢুকতে পারবে।

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নারী ছলেমা খাতুন বলেন- ‘মংডুতে এখনো আমাদের   অনেক আত্মীয়-স্বজন থেকে গেছে। তারা এতদিন সেখানে নিরাপদে ছিল। মগ ও সেনাবাহিনীর   সঙ্গে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছিল না। কিন্তু সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের পর থেকে তারা কিছুটা ভয়ে আছে।

তিনি বলেন, এখন যারা ক্ষমতা নিয়েছে এই সেনাবাহিনীই রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের পুরোটা অংশ জুড়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তারা এখন সেখানকার রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক হবে, সেরকম আশা করা যাচ্ছে না।’

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা মোহাম্মদ আলম এ প্রসঙ্গে বলেন- ‘আমরা আশা করছি মিয়ানমারের নতুন সেনা প্রশাসন বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন বিষয়ে অতীতের ধারাবাহিকতা  বজায় রাখবে। কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসুক সেটা আমাদের মোটেও কাম্য নয়। আমরা চাচ্ছি, প্রত্যাবাসন আলোচনা অব্যাহত রেখে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হোক।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কাছে মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গা স্বজনরা এপারে চলে আসার   পরামর্শ চাইলে আমরা তাদের আসার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছি। নতুন করে কোনো রোহিঙ্গার আগমন ঘটলে, আগে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে ফেরার স্বপ্নভঙ্গ হতে পারে।’ তবে মিয়ানমারের রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ করেন এমন কয়েকজন রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সেনা নির্যাতনের শংকা উড়িয়ে দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নূর নামের কুতুপালং শিবিরের একজন রোহিঙ্গা নেতা অবশ্য ভিন্নমতের কথা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের যে সেনাবাহিনী ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতা চালিয়েছিল তারা আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে সেই ঘটনা নিয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক আদালতের রায়েও তারা দোষীসাব্যস্ত হয়েছে। সেই সেনাবাহিনী নতুন করে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর আবার অত্যাচার-নির্যাতন চালাবে বলে মনে হয় না-বলেন মোহাম্মদ নূর। এ কারণে তিনি নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশংকা করেন না।

এদিকে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পরে নতুন করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে এমন আশঙ্কায় সীমান্তে বাড়তি নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ   (বিজিবি)। এছাড়া মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের জলসীমায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারে রাখাইনে কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা হওয়ার পরে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে দুর্যোগের ঝড়। গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলে উপায়ান্তর না দেখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে   বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। নতুন পুরাতন মিলে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা এখন এগারো লাখের বেশি। তাদের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ের ৩৪টি ক্যাম্পে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

কালেরকন্ঠ