চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের উত্তর কুঞ্জরী গ্রামে সাদামাটা এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন টেকনাফ থানার সদ্য বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। তার বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা প্রহরী। সঙ্গত কারণেই কিছুটা টানাপড়েনের মধ্যে সংসার চালাতে হতো তাকে। তবে তাদের দুই ছেলে প্রদীপ ও সদীপ পুলিশের চাকরি পাওয়ার পর পরিবারটির অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে।

বড় ছেলে প্রদীপ ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে পুলিশের এসআই পদে চাকরি পান। ঐ চাকরিটাই ছিল প্রদীপের পরিবারের জন্য বড় আশীর্বাদ। পুলিশের চাকরি পেয়ে যেন রূপকথার আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে পান প্রদীপ। ২০০৯ সালে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি লাভ করার পর রীতিমত আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠেন প্রদীপ। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে।

২০১৮ সালের জুনের মাঝামাঝি তার সম্পদের প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রদীপ ও তার স্ত্রী চুমকির নামে অস্বাভাবিক সম্পদের তথ্য পান দুদক কর্মকর্তারা। এরপর সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য তাদের চিঠি দেওয়া হয়। একই বছরের মে মাসে তারা সম্পদ বিবরণী দুদকে জমা দেন। ঐ বছরের ১৮ নভেম্বর দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তারা প্রদীপ ও তার স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে প্রতিবেদন ঢাকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠান। তবে ঢাকা কার্যালয় থেকে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা না দেওয়ার কারণে ফাইলটি সেখানেই পড়ে থাকে। তবে সম্প্রতি প্রদীপ বরখাস্ত হওয়ায় ফাইলটি ফের সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে দুদক।

দুদক সূত্র জানায়, প্রদীপ নিজের চেয়ে তার স্ত্রী চুমকির নামে বেশি সম্পদ কিনেছেন। এর মধ্যে বোয়ালখালীতে দুই একর জমির ওপর বিশাল পুকুর এবং চট্টগ্রাম নগরীতে ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’ নামে একটি বহুতল ভবন রয়েছে। দুদকে দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে প্রদীপ তার নিজের ও স্ত্রীর নামে ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৫১ হাজার ৩০০ টাকার সম্পদ রয়েছে বলে জানান। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সম্পদের বাইরেও দেশে-বিদেশে ওসি প্রদীপের বিপুল সম্পদ রয়েছে যার মূল্য দাঁড়াবে বাংলাদেশি টাকায় শত কোটি টাকা; যা তিনি অবৈধভাবে অর্জন করেছেন। মূলত গত দুই বছর টেকনাফের ওসি থাকার সময় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে প্রদীপ বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন বলে দুদক কর্মকর্তারা মনে করছেন।

প্রদীপের এক ভাই সদীপ কুমার দাশ সিএমপির ডবলমুরিং থানায় ওসি হিসেবে কর্মরত। সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক স্কুলছাত্র হত্যার ঘটনায় ভাই প্রদীপ দাশের মতো বিতর্কিত হয়ে পড়েন সদীপ কুমার দাশও। তাদের আরেক ভাই দিলীপ কুমার দাশ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের হেডক্লার্ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অবসর নিয়েছেন। জানা গেছে, জেলা পুলিশে কর্মরত থাকার সুবাদে ভাইয়ের ভালো পোস্টিং পেতে সহায়তা করতেন দিলীপ কুমার দাশ। জানা গেছে, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে টেকনাফ থানার ওসি পদে রদবদলে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও চট্টগ্রাম রেঞ্জ কার্যালয় থেকে প্রদীপকে সেখানে রাখার জন্য সুপারিশ করা হতো।

প্রদীপ নিজের খুঁটির জোরে ঘুরেফিরে পোস্টিং নিতেন শুধু সিএমপি আর কক্সবাজার জেলায়। মাঝখানে কিছুদিন তিনি সিলেটে ছিলেন। চাকরি জীবনে ঘুষ দাবিসহ নানা অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত, প্রত্যাহার ও বদলি হয়েছেন একাধিকবার। কিন্তু সব সামলে ঠিকই বাগিয়ে নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসি পদ। মাত্র ২৪ বছরে নামে বেনামে গড়েছেন অঢেল সম্পদ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের লালখান বাজারে একটি ফ্ল্যাট, কক্সবাজারে দুটি হোটেলের মালিকানা, বোয়ালখালীতে স্ত্রী চুমকির নামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ যার মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটায় রয়েছে লক্ষ্মীকুঞ্জ নামে বহুতল ভবন। এছাড়া ভারতের আগরতলা ও অস্ট্রেলিয়ায় তার বাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিদেশে টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে প্রদীপের বিরুদ্ধে।

কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেল ও বারে প্রদীপের নিয়মিত যাতায়াত ছিল এবং তিনি বিভিন্ন হোটেলে নাচগানের আসর বসাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুরে আপন বোনের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও আছে প্রদীপের বিরুদ্ধে। দুদকের হিসাব বিবরণীতে প্রদীপের নিজের নামে জমি কিংবা বাড়ি থাকার কথা উল্লেখ করেননি। নথিতে তিনি তার আয় দেখিয়েছেন বেতনভাতা, শান্তিরক্ষা মিশন থেকে প্রাপ্ত ভাতা ও জিপিএফর সুদ থেকে প্রাপ্ত টাকা।