মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী ::

সরকারি চাকুরীজীবীদের সহজাত নিয়ম হচ্ছে-নিয়োগ, বদলী, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, অবসর ইত্যাদি। সেই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের উখিয়াতে অত্যন্ত কঠিন সময়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন একজন মেধাবী ও চৌকস কর্মকর্তা। দীর্ঘ প্রায় ৩ বছর দায়িত্ব পালন করার পর সেই সফল কর্মকর্তা সহজাত নিয়মের সাইকেলিং পড়ে সরকরীভাবে উচ্চ শিক্ষায় বিদেশ যেতে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। কিন্তু সে বিদায় দেওয়া হয়েছে সর্বস্থরের মানুষের অশ্রু সজল নয়নে।

যার কথা এতক্ষণ বলছিলাম তিনি হলেন-উখিয়ার বিদায়ী ইউএনও মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান। উখিয়াতে প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি সর্বস্থরের মানুষের একজন প্রিয় পাত্রে পরিনত হয়েছেন। প্রায় সকল পেশার মানুষ তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন নিজেদের অজান্তে। মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর উখিয়ার ইউএনও হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার তিনি শেষ কর্মদিবস অতিবাহিত করেছেন। উখিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ আমিমুল এহসানকে বৃহস্পতিবার তিনি ইউএনও এর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন।

এর আগে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারকে শক্তিশালীকরণ (২য় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বৈদেশিক মাস্টার্স কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান (১৬৮১১) সহ ৬০ জন কর্মকর্তা মনোনীত হন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন গত ১৩ আগস্ট ১৫০ নম্বর স্মারকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারী করেন। মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত উচ্চতর বিদ্যাপীট ইউনিভার্সিটি অব রিডিং এ পাবলিক পলিসি (ফুল টাইম) বিষয়ে মাস্টার্স করবেন।

মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান ইউএনও হিসাবে দায়িত্ব পালনকালীন দ্রুততম সময়ে নাগরিক সেবা প্রদান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং ই- ফাইলিং কার্যক্রমে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার জেলা প্রশাসন তাঁকে শুদ্ধাচার পুরস্কারে ভূষিত করেছিলো। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে সেদিন এ সম্মানজনক পুরস্কার ইউএনও মোহাম্মদ নিকারুজ্জামানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কক্সবাজার জেলার ইউএনও ক্যাটাগরীতে বিভিন্ন সূচকে লক্ষ্যমাত্রা অজর্নের স্বীকৃতি স্বরূপ শুদ্ধাচার স্মারক ও সনদ দেওয়া হয়েছিলো ইউএনও মোহাম্মদ নিকারুজ্জামানকে।

কর্মকর্তারা মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গণমানুষের হৃদয় জয়করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। উখিয়ার সর্বস্থরের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া উখিয়া’র ইউএনও মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান ১৯৮৬ সালের ১০ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার চন্দনাইশ পৌরসভার চৌধুরী পাড়ায় জম্ম গ্রহন করেন। তিনি চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) হতে ২০১০ সালে সিভিল ইন্জিনিয়ারিং-এ কৃতিত্বের সাথে বিএসসি পাশ করেন। মরহুম এম. ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী ও খালেদা জামান চৌধুরী’র জ্যেষ্ঠ পুত্র মোঃ নিকারুজ্জামান ২০১১ সালে ৩০তম বিসিএস পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে দেশের সবচেয়ে বুনিয়াদি ও সিদ্ধান্ত গ্রহনকারী ক্যাডার হিসাবে পরিচিত বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। মোঃ নিকারুজ্জামান ২০১২ সালের ৩ জুন নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনে সহকারী কমিশনার হিসাবে সর্বপ্রথম সরকারি চাকুরীতে যোগ দেন। এরপর তিনি আর পেছনে থাকাননি। কুমিল্লা জেলা প্রশাসনে সহকারী কমিশনার ও প্রথম শ্রেণীর নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট হিসাবে, নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলা ও কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসাবে পর পর সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। অত্যন্ত মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে চাকুরীতে বিভিন্ন জায়গায় উজ্জ্বলতার স্বাক্ষর রাখায় মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান রামু উপজেলার এসি (ল্যান্ড) থাকাবস্থায় মিয়ানমার থেকে ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট রোহিঙ্গা শরনার্থী আসার ঢল নামার সেই সংকটময় সময়ে প্রথমে উখিয়া উপজেলা প্রশাসনে তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। সেখানেও তাঁর প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর রাখায় মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসাবে নিয়োগ পান। মিয়ানমার থেকে বন্যার স্রোতের মতো আসা রোহিঙ্গা শরনার্থী ব্যবস্থাপনার জন্য সম্পূর্ণ অগোছালো ও অপ্রস্তুত অবস্থায় সেই দায়িত্ব তিনি সুচারুরূপে, পেশাদারিত্ব ও দূরদর্শিতা দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে পালন করেন। ইউএনও মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান সহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থী আগমনের সেই মহাসংকট সময় কাটিয়ে উঠতে প্রশাসন সক্ষম হন। যা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়। ফলশ্রুতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “মাদার অব হিউমিনিটি” হিসাবে উপাধি পান। রোহিঙ্গা শরনার্থী সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ২০১৯ সালে অর্জন করে অত্যন্ত মূল্যবান ‘জনপ্রশাসন পদক’। মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান ২০২০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী হতে ২১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত International Visitor Leadership Programme (IVLP) এর অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি-তে ‘Disaster Prepareness and Emergency Management’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সফলতার সাথে।

মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর এলাকার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট ফারজানা কামাল’কে ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জীবন সঙ্গিনী হিসাবে বেঁচে নেন। ফারজানা কামাল নিজে একজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। তবে তিনি এখন আইন পেশা চর্চা নাকরে ব্যাংকিং পেশাকে বেচে নিয়েছেন পেশা হিসাবে। ফারজানা কামাল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক উখিয়া উপজেলার কোটবাজার শাখায় কর্মরত একজন উর্ধ্বতন কর্মকতা। মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান ও ফারজানা কামাল এক কন্যা সন্তানের জনক ও জননী।

বিস্ময়কর প্রতিভাসম্পন্ন উখিয়ার বিদায়ী ইউএনও মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান মহান আল্লাহতায়লার কাছে শোকরিয়া জ্ঞাপন করে বলেন, প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালন কালে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করতে চেষ্টা করেছি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যারা ভূল বুঝেছেন, মনে কষ্ট পেয়েছেন, তাদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সকলের অপরিসীম সহযোগিতার জন্য তিনি সবার প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তার সাথে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন, জেলা প্রশাসনের সকল এডিসি, এডিএম সহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানা। উখিয়ার মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা তাঁর জীবনে চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উখিয়ার মানুষের আন্তরিকতা তাকে সবসময় প্রেরণা ও প্রত্যয়ে সমৃদ্ধ করেছে। মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান বলেন, ইউএনও হিসাবে সফল হয়েছি কিনা জানিনা-তবে সকলে সম্মিলিতভাবে যথাযথ দায়িত্ব পালন নাকরলে আমার একার পক্ষে কোন অর্জন সম্ভব হতোনা। তিনি ভবিষ্যতে তাঁর পথ চলায় সকলের সহযোগিতা, দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করেছেন।

প্রসঙ্গত, উখিয়াতে নতুন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসাবে নিয়োগ পাওয়া নিজামুদ্দীন আহমদ (১৭৫৮৪) আগামী সাপ্তাহের শেষ দিকে উখিয়ায় যোগদান করতে পারেন বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) শংকর রঞ্জন সাহা কর্তৃক ১৯৬ স্মারকে জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনে নিজামুদ্দীন আহমদ সহ ১০ জন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাকে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় ইউএনও হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। উখিয়াতে নতুন নিয়োগ পাওয়া ইউএনও নিজামুদ্দীন আহমদ কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা। তাঁর শ্বশুর বাড়ি চট্টগ্রামে।